নেইমার ফুটবলের অপূর্ণ এক মহাকাব্য
নেইমার ফুটবলের অপূর্ণ এক মহাকাব্য। ফুটবল সম্পর্কে জানে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর! পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, উন্মাদনা আর স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছে এই খেলাটি। এই ফুটবলকে ঘিরে যুগে যুগে জন্ম নিয়েছেন অসংখ্য কিংবদন্তি। যাদের নাম ফুটবল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাদের মধ্যে একজন নেইমার জুনিয়র। কেউ গোলের বন্যায় ইতিহাস লিখেছেন, কেউ অ্যাসিস্টের জাদুতে সতীর্থদের নায়ক বানিয়েছেন, কেউ ট্রফির পর ট্রফি জিতেছেন।
আবার কেউ কেউ ফুটবলকে শুধু খেলা হিসেবে নয়, একটি শিল্প হিসেবে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। তাইতো কারও কারও নামের সঙ্গে জুড়ে গেছে সর্বকালের সেরা, কাউকে বলা হয়েছে ফুটবলের রাজা, আবার কাউকে বলা হয়েছে মহারাজা। কিন্তু এতসব রাজা-মহারাজার ভিড়ে একজন যেন চিরকাল থেকে গেলেন ফুটবলের সেই হতভাগা রাজপুত্র! যার রাজা হওয়ার সামর্থ্য ছিল, প্রতিভা ছিল, জাদু ছিল; শুধু ভাগ্যটা ফেবারে ছিল না। বলছি নেইমার দা সিলভা সান্তোস জুনিয়র-নেইমার Jr এর কথা।পেজ সুচিপত্র
ফুটবলে রাজপুত্রের আবির্ভাব
২০০৯ সালের ৭ মার্চ, মাত্র ১৭ বছর বয়সে সান্তোসের জার্সিতে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় নেইমারের। পাকােম্বু স্টেডিয়ামে ওয়েস্টের বিপক্ষে সেই ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামেন তিনি। মাত্র কয়েকটি স্পর্শেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এই ছেলেটির মধ্যে অন্যরকম কিছু আছে।
মাত্র আট দিন পরে ১৫ মার্চ ২০০৯ সালে মোগি মিরিমের বিপক্ষে করেন নিজের প্রথম পেশাদার গোল। তখন থেকেই শুরু হয় এক নতুন গল্প, এক কিশোরের গল্প, যে ধীরে ধীরে হয়ে উঠবে ব্রাজিলের নতুন ফুটবল জাদুকর।
সান্তোসে তাঁর প্রতিভার বিস্ফোরণ ছিল অবিশ্বাস্য। ড্রিবলিং, গতি, ফ্লেয়ার, বল নিয়ন্ত্রণ, অপ্রত্যাশিত পাস এবং গোল করার ক্ষমতা সব মিলিয়ে নেইমার খুব দ্রুতই বিশ্ব ফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন।
নেইমার যখন মাঠে নামতেন
নেইমার যখন মাঠে নামতেন দর্শক শুধু তাঁকে দেখতে বা তাঁর গোল দেখার জন্য মাঠে আসত না। তারা আসত নেইমারের শৈল্পিক ও নন্দনিক ফুটবল জাদু দেখতে। তার পায়ে বল মানেই দর্শকদের মধ্যে অপেক্ষা - এবার কী হবে? কারণ নেইমারের খেলা শুধু ফলাফলের জন্য দেখা হতো না; দেখা হতো সৌন্দর্যের জন্য।
আরও পড়ুন ঃ নেইমার জুনিয়র ফুটবলে এক নতুন জাদুঘরের নাম।
একজন ডিফেন্ডারের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ শরীরটা একদিকে নিয়ে বলটা অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়া, একের পর এক প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া, কোণ থেকে অসম্ভব গোলের চেষ্টা করা, সতীর্থকে এমন পাস দেওয়া যার কথা সাধারণ খেলোয়াড়ের মাথায়ই আসবে না। নেইমারের ফুটবল ছিল অনেকটা শিল্পীর তুলির আঁচড়ের মতো।
সান্তোস থেকে বার্সেলোনা - রাজপুত্রের রাজদরবারে প্রবেশ
সান্তোসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পর ২০১৩ সালে নেইমার পাড়ি জমান ইউরোপে। গন্তব্য - বার্সেলোনা। সেখানে তাঁর সঙ্গে জুটি বাঁধলেন লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজ। জন্ম নিল ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত আক্রমণভাগ - MSN। মেসি, সুয়ারেজ ও নেইমার - তিনজন মিলে এমন এক আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিয়েছিলেন যা আজও ফুটবল প্রেমীদের স্মৃতিতে জীবন্ত।
আরও পড়ুন ঃ বাংলাদেশ ক্রিকেটের আদ্যপ্রান্ত জানতে এখানে ক্লিক করুন।
বার্সেলোনায় নেইমার জিতেছেন লা লিগা, কোপা দেল রে এবং ২০১৫ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ একাধিক শিরোপা। বার্সেলোনার হয়ে তাঁর ১৯৬ ম্যাচে ১১৪ টি গোলের রেকর্ড রয়েছে। ২০১৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী বার্সেলোনা দলের অংশ হিসেবে নেইমার নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অধ্যায় লিখেছিলেন।
নেইমারের নতুন ইতিহাস ২০১৭
নেইমার মহাকাব্যের নতুন সূচনা ২০১৭ সাল। ২০১৭ সালে নেইমার Jr বার্সেলোনা ছেড়ে যোগ দেন প্যারিস সেন্ট জার্মেইনে (PSG)। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় ট্রান্সফারের মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত খেলোয়াড়দের একজন।
আরও পড়ুন ঃ দড়ি লাফ খেলার ১২র্টি উপকারিতা ও সতর্কতা।
প্যারিসে তিনি দেখিয়েছেন তাঁর গোল করার পাশাপাশি সৃষ্টিশীলতার আরেক রূপ। PSG 'র হয়ে ১৭৩ ম্যাচে ১১৮ টি গোল ও ৬৯ টি অ্যাসিস্ট করেছেন বলে FBref এর পরিসংখ্যান দেখায়। কিন্তু এখান থেকেই যেন তাঁর জীবনে আরেকটি অধ্যায় শুরু হয় সেটি হলো ইনজুরির সঙ্গে যুদ্ধ।
নেইমারের প্রতিভার সঙ্গে ভাগ্যের যুদ্ধ
নেইমারের বড় প্রতিপক্ষ কোন ডিফেন্ডার ছিল না, ছিল তাঁর নিজের শরীর। একটির পর একটি ইনজুরি তাঁর ক্যারিয়ারের গতি থামিয়ে দিয়েছে। যে সময়ে তাঁর আরও অসংখ্য ম্যাচ খেলার কথা ছিল, আরও অনেক গোল করার কথা ছিল, আরও অনেক শিরোপা জেতার কথা ছিল! সেই সময়ের বড় একটি অংশ তাঁকে কাটাতে হয়েছে মাঠের বাইরে।
এ কারণেই নেইমারের গল্পটা এতটা বেদনাদায়ক। একজন খেলোয়াড়ের প্রতিভা যতটা বড়, তাঁর অপূর্ণতার গল্পটাও ততটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ফুটবলপ্রেমীর মনে আজও প্রশ্ন? নেইমার যদি এতগুলো ইনজুরিতে না পড়তেন, তাহলে তাঁর ক্যারিয়ার কোথায় গিয়ে থামত? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনোদিন পাওয়া যাবে না।
ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমার
ব্রাজিলের হয়ে নেইমারের গল্প আরও আবেগের। তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় তারকা, যার কাঁধে ব্রাজিলের প্রত্যাশার বিশাল বোঝা ছিল। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে মাত্র ১৮ বছর বয়সে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেকেই গোল করেন তিনি। এরপর বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, কনফেডারেশনস কাপ, অলিম্পিক - ব্রাজিলের জার্সিতে একের পর এক বড় মঞ্চে নিজের ছাপ রেখেছেন তিনি।
২০১৩ সালে কনফেডারেশনস কাপ জয় এবং ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে ব্রাজিলের হয়ে স্বর্ণপদক জয় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অর্জন। আর সবচেয়ে বড় বিষয় - ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় তিনি পেলের রেকর্ডও পেরিয়ে গেছেন। ২০২৩ সালে ব্রাজিলের হয়ে ৭৯তম গোল করে তিনি পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
নেইমারের ক্যারিয়ারে রেকর্ড ও অর্জন
নেইমার জুনিয়র বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলার সময় তার ক্যারিয়ারে অনেক অর্জন ও রেকর্ড রয়েছে যেগুলো নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো -
- সান্তোসের হয়ে ঃ ২৩০ ম্যাচ ১৩৮ গোল - ক্লাবের ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী,
- বার্সেলোনার হয়ে ঃ ১৯৬ ম্যাচ ১১৪ গোল,
- PSG 'র হয়ে ঃ ১৭৩ ম্যাচ ১১৮ গোল ও ৬৯ অ্যাসিস্ট,
- বার্সেলোনার হয়ে ঃ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (২০১৪–১৫),
- লা লিগা ও কোপা দেল রে সহ একাধিক শিরোপা,
- সান্তোসের হয়ে ঃ কোপা লিবার্তাদোরেস ২০১১,
- ব্রাজিলের হয়ে ঃ কনফেডারেশনস কাপ ২০১৩,
- ব্রাজিলের হয়ে ঃ অলিম্পিক স্বর্ণপদক ২০১৬। ইত্যাদি।
নেইমারের ব্যক্তিগত অর্জন ও রেকর্ড
- ব্রাজিলের পুরুষ জাতীয় দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
- ২০১৫ সালের ব্যালন ডি'অর তৃতীয় স্থান।
- ২০১১ সালের ফিফা পুসকাস অ্যাওয়ার্ড।
- ২০১১ সালের দক্ষিণ আমেরিকার সেরা খেলোয়াড়।
- ২০১২ সালের কোপা লিবার্তাদোরেসের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
- ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রোঞ্জ বুট।
- চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও FIFPro এর বর্ষসেরা একাদশে অন্তর্ভুক্তি।
নেইমারের পেশাদার অভিষেক
- ৭ মার্চ ২০০৯ সান্তোস বনাম ওয়েস্ট, পাকােম্বু স্টেডিয়াম।
- মাত্র ১৭ বছর বয়সে নেইমারের পেশাদার ফুটবলে যাত্রা শুরু।
- প্রথম পেশাদার গোল ঃ ১৫ মার্চ ২০০৯ - সান্তোস বনাম মোগি মিরিম।
- জাতীয় দলে অভিষেক ঃ ১০ আগস্ট ২০১০ - ব্রাজিল বনাম যুক্তরাষ্ট্র, অভিষেকেই গোল।
- ২০ আগস্ট মাকারার বিপক্ষে সুল-আমেরিকানার ম্যাচে তাঁকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল, তাই সেটি তাঁর শেষ ম্যাচ নয়।
নেইমার কেন রাজা হলেন না?
নেইমার কেন রাজা হলেন না? হয়তো এটাই নেইমার গল্পের কষ্টের সবচেয়ে অংশ। তিনি প্রতিভায় কারও চেয়ে কম ছিলেন না। তাঁর পায়ে ছিল জাদু, মাথায় ছিল সৃজনশীলতা, শরীরে ছিল গতি, আর ফুটবলের প্রতি ছিল অসাধারণ ভালোবাসা। কিন্তু ফুটবল কখনও কখনও প্রতিভার চেয়েও বেশি কিছু দাবি করে।
বিশেষ করে সুস্থ শরীর, ধারাবাহিকতা এবং ভাগ্য। আর এই তিনটির মধ্যে শেষের দুটির সঙ্গে নেইমারের লড়াই ছিল দীর্ঘ। তিনি এমন এক সময়ে খেলেছেন, যখন পৃথিবীর ফুটবল মেসি ও রোনালদোর রাজত্ব দেখেছে। সেই দুই মহারাজার ছায়ায় থেকেও নেইমার নিজের জন্য আলাদা একটি রাজ্য তৈরি করেছিলেন।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়—যদি ইনজুরিগুলো না আসত? যদি তাঁর শরীর তাঁকে আরও ৫–৬টি বছর একইভাবে খেলতে দিত? যদি তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো হাসপাতাল, পুনর্বাসন আর মাঠের বাইরে কাটতে না হতো? তাহলে হয়তো আজ আমরা বলতাম - নেইমার শুধু ফুটবলের রাজপুত্র ছিলেন না, ছিলেন ফুটবলের একজন রাজা।
উপসংহার
ফুটবলের ইতিহাসে অনেক খেলোয়াড় তাঁদের গোলের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, কেউ ট্রফির জন্য, কেউ রেকর্ডের জন্য। কিন্তু নেইমারকে হয়তো মানুষ মনে রাখবে অন্য কারণে। তাঁকে মনে রাখবে ফুটবলকে সুন্দর করে তোলার জন্য। কারণ নেইমার যখন বল পায়ে দৌড়াতেন, তখন মনে হতো ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের একটি খেলা নয়, এটা একটি শিল্প। তিনি হয়তো সব রেকর্ড ভাঙতে পারেননি। হয়তো যতগুলো ট্রফি তাঁর হাতে থাকার কথা ছিল, ততগুলো নেই। হয়তো তাঁর ক্যারিয়ার তাঁর প্রতিভার মতো দীর্ঘ ও ধারাবাহিক হয়নি। একজন ফুটবলারকে মহান করে শুধু তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেট নয়!
কখনও কখনও মানুষের হৃদয়ে তাঁর রেখে যাওয়া অনুভূতিটাই সবচেয়ে বড় অর্জন। আর সেই জায়গায় নেইমার অনেক আগেই জিতে গেছেন। তিনি হয়তো ফুটবলের রাজা হতে পারেননি—কিন্তু তিনি চিরকাল ফুটবলের সেই জাদুকর রাজপুত্র হয়ে থাকবেন, যাকে পৃথিবী ভালবেসেছিল তার পায়ের জাদুর জন্য। কোন এক দিন হয়তো তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বাঁশি বাজবে। সেদিন ফুটবলপ্রেমীদের মনে একটি প্রশ্নই ঘুরবে! “নেইমার যদি ইনজুরিতে এতটা সময় না হারাতেন, তাহলে ফুটবলের ইতিহাসটা আজ ভিন্ন হতো” এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো নেইমার নিজেও জানেন না। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত - নেইমারের মতো খেলোয়াড় বারবার জন্মায় না।

aksgreenit নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url